keep happineswss

সুখ কিভাবে ধরে রাখি? সুখের খোঁজে : পর্ব ০১

সুখ কিভাবে ধরে রাখি? সুখের খোঁজে : পর্ব ০১
সুখের খোঁজে – নাম দিয়েই বুঝা যাচ্ছে আমরা সুখ খোজার চেষ্টা করবো। আমরা প্রতিনিয়তই সুখ খুজছি, তাই নয় কি? এতো পরিশ্রম, পড়াশুনা, অনলাইন লার্নিং সেশন, ট্রেনিং, সেমিনার – এত্তোকিছু আমরা কি জন্য করি?
সুখের জন্য!


এই আশায় যে, আমরা এখন কস্ট করলে ভবিষ্যতে ভালো থাকবো, ভালো চাকরি হবে; ভালো চাকরি হলে, ভালো বেতন; ভালো বেতন হলে ভালো বাড়ি-গাড়ি, আর এসব মানেই শান্তি, সুখ?
আসলেই কি তাই?
আজকে তেমনই কিছু বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করবো।


আমরা প্রতিনিয়ত নানা রকম নতুন নতুন জিনিসের পিছনে ছুটি। নির্দিষ্টভাবে বললে, নতুন, এবং আগের চেয়ে ভালো জিনিস।
জব কেনো পাল্টায় মানুষ? আগের চেয়ে ভালো সুযোগ-সুবিধা বেতনের জন্য! আমরা নতুন ফোন কিনি কেন? আগের চেয়ে ভালো অবস্থার জন্য? হয়তো, আমার ফোন নস্ট -তাই; কিংবা নতুন ফোনটা আগের চেয়ে ভালো – দুটোর একটা কারণেই তো কিনি, তাইনা?
কিন্তু, একটা সময়ে গিয়ে আমরা সেটায় অভ্যস্ত হয়ে যাই। নতুন গাড়িতে যেমন যত্ন নেই, ক’মাস পর আমাদের যত্নের পরিমাণ কি আগের মতো থাকে? থাকে না। আস্তে আস্তে কমে। নতুন ফোন কিনলেও তাই হয়। বাড়িয়ে নতুন রঙ করলে ১ সপ্তাহ কোনো দাগ লাগতে দেইনা, তারপর কি আর খবর রাখি আসলে? কক্সবাজার ঘুরে আসলাম। ৪-৫ দিন মনে আলাদা একটা উত্তেজনা থাকে, যাবার আগে – আসার পরে। কিন্তু, ৫-৬ দিন পর কি আর তেমন উত্তেজনা থাকে? ১ মাস পর? ৩ মাস পর? বাড়িতে মা-বাবা রেখে ভার্সিটিতে গেলাম, খারাপ লাগে অনেক প্রথমে। কিন্তু, ১ মাস পর? ৩ মাস পর? ১ বছর পর? আস্তে আস্তে খারাপ লাগাটা মিলিয়ে যায়। তাইনা?
আসলে কি হয়? আমরা মানিয়ে নেই। আমাদের মন ও শরীর পরিবেশের সাথে নিজেকে প্রতিনিয়ত মানিয়ে নেয়। খারাপের বেলা মানিয়ে নেয়াটা বেশ উপকারী হলেও, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটা মনে একধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নতুন ফোন টা, নতুন গাড়িটা, ১ সপ্তাহ আগে দিয়ে আসা ট্যুর টা আমাদেরকে কদিন পর আর আনন্দ দেয় না।সুখ কিভাবে ধরে রাখি? বা, আনন্দের প্রভাবটা থাকে না।
কিন্তু, এমন নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন জিনিস কি আমাদের জীবনে প্রতিনিয়ত আসে?
একজন এক বছরে কটা ফোন কিনে? ধরলাম , দুটো! ১ টা ফোনের আনন্দ ১ মাস থাকলে বাকি ১০ মাস সে কী করবে? বছরে কদিন আমরা ট্যুরে থাকি?
এসব খুব আনন্দের মুহূর্ত আমাদের লাইফে খুবই কম। বছরের বেশিরভাহ সময়ই আমাদের বোরিং, পুরনো জিনিস নিয়ে।
তাই, সুখে থাকতে হলে, আমাদেরকে এ পুরনো জিনিসগুলোকেই নতুন ভাবে বুঝতে, দেখতে, অনুভব করতে শিখতে হবে।
কথা হচ্ছে, এটা কি আসলেই কাজে দেয়?
বিজ্ঞানী লুবোমিরস্কি ও তার সহকর্মীরা ২০০৬ সালে একটা গবেষণা করেন। সেখানে একদল শিক্ষার্থীকে তাদের লাস্ট কোথাও দেয়া ট্যুর নিয়ে দিনে ৮ মিনিট করে ভাবতে দেয়া হয়, ৩ দিন! মোট ২৪ মিনিট! কি মনে হয়, কেমন প্রভাব ফেলবে?
৩ দিন পর দেখা যায়, তাদের হ্যাপিনেস লেভেল অন্যদের চেয়ে ০.৬-১ (১০ এ) এর মতো বেশি! আর, এভাবে ৩ মাস কাটানোর পর? ১.২-১.৩ লেভেল বেশি। এবং, তাদের সেমিস্টার রেজাল্টে সিজিপিএ এর গড় উন্নতি আগের চেয়ে ০.৩!! ভাবা যায়??
তাহলে, বোঝা গেলো – প্রতিদিন আগের সুখস্মৃতি নিয়ে ভাবলে হ্যাপিনেস বাড়ে। মন ফ্রেশ থাকে, প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে!


এটা টিপস নাম্বার ০১!

তবে, কোন মোমেন্ট গুলো ভাববেন সেটা নিয়েও আপনাকে দেখতে হবে!
স্দ্য প্রয়াত স্ত্রীকে নিয়ে ভাবলে আনন্দ পাবেন? নাকি, আপনার গ্র্যাজুয়েশনের দিন নিয়ে ভাবলে আনন্দ পাবেন, নাকি, লাইফে প্রথম কাপ্তাই লেকে গিয়ে কায়াক চালানোর অভিজ্ঞতা কল্পনা করলে খুশি হবেন – সেটা আপনিই ভালো বুঝবেন!
একটা ট্যুরে গেলে দুই ধরনের মানুষ দেখা যায় – কেউ ক্যামেরায় ব্যস্ত, কেউ প্রকৃতিকে দেখায়! এদিকে দুটো জিনিস আছে, যারা প্রকৃতিকে যত আপন করে নিতে পারে, তাদের মনও ততদিন সেটাকে মনে রাখে। আপনি যদি ক্যামেরার মাঝেও নিজেকে প্রকৃতিতে ডুবিয়ে রাখতে পারেন, তাহলে আরো ভালো।
আবার, কোনো ট্যুরে যাবার আগেও আমাদের মধ্যে অনেক আনন্দ-উত্তেজনা কাজ করে। শেষেও করে। এভাবে আমরা যদি পুরো সময়টা উপভোগ করি, তাহলে আমরা ৩-৪ মাস পরেও চোখ বন্ধ করে সেদিনটা অনুভব করতে পারবো। সেদিনটা আমাদের জীবনে দেয়ার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ হবো। আর, এভাবেই, একটা ট্যুর আমাদেরকে ১ বছর খুশি রাখবে। দুমাস পরেই “আবার কবে ট্যুর দিবো!” বলে চিল্লাবোনা!
রেস্টুরেস্টে গেলেই চেক-ইন দিতে হয়না। খাবার আসলেই ছবি তুলতে হয়না। সেটা তোলা যে ভুল, তাও না; উত্তেজনাটা যেন খাবার খাওয়ার আনন্দটাকে ছাড়িয়ে না যায়। আমি বার্গার নিলাম, বন্ধু চকলেট কেক নিলো – বন্ধুর চকলেট কেক খাওয়ার আনন্দ/অনুভূতি দেখে আমার যেন এমন মনে না হয়, যে, “ইশ! আমি কেন নিলাম না। আমি কেন বার্গার নিলাম!” এমন হলে বার্গার খাবার আনন্দটাও আপনি হারিয়ে ফেলবেন। এবং, আমাদের অবচেতন মনে এটা খুব সাধারণ। তাই, আমরা আমাদের ফোকাস আমাদের নিজের উপর রাখবো। নিজে উপভোগ করায় মন দিবো।
তাহলে এ পার্টে আমাদের শিক্ষা কি? আমরা কোনো কাজ করার সময় তা মন দিয়ে করবো। ট্যুরে গেলে প্রকৃতিকে আপন করে নিবো! কোথাও খেতে গেলে গেলে খাবারের স্বাদ-দেখার সৌন্দর্য্য এসব উপভোগ করবো। সবকিছু হবে নিজের জন্য, ইন্সটাগ্রাম আর ফেসবুকের জন্য না!


এটা টিপস নাম্বার ০২!

তারপর, আসে- ফাইটিং নেগেটিভিটি। নিজের মনে আসা নেগেটিভ ইমোশনের সাথে ফাইট করা। আমরা অনেক সময়ই ভালোকে হারানোর ভয়ে এমনভাবে ভীত থাকি যে, আমরা ভালোটা ঠিকভাবে এনজয়ই করতে পারিনা! সুখ কিভাবে ধরে রাখি? ভার্সিটির গ্রাজুয়েশন, ট্যুরের লাস্ট দিন, বন্ধের শেষদিন – আমরা পাওার আনন্দের চেয়ে হারানোর ভয়ে বেশি থাকি।


এ নিয়ে একটা গবেষণা করা হয়, ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ায় গবেষক কার্টজ এর অধীনে ১ম বর্ষ, ৩য় বর্ষ, ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে। তাদেরকে বলা হয়, তারা গ্র্যাজুয়েশনের পর তাদের মনের অবস্থা নিয়ে লিখতে। ১ম বর্ষ ও ৩য় বর্ষের বেলায় তেমন পার্থক্য পাওয়া না গেলেও , গ্র্যাজুয়েশনের শিক্ষার্থীদেরকে বেশ মন খারাপ করতে দেখা যায়, যে এতোদিনের বন্ধু-ক্যাম্পাস অনেক মিস করবে – এসব। তাদের অর্ধেককে নিয়ে একটা সেশন করা যায়, যেখানে তাদেরকে কৃজ্ঞতাবোধ বিষয়টি বুঝানো হয়, বরং, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে ১ ঘন্টা লিখতে দেয়া হয়। তারপর, আবার তাদের হ্যাপিনেস মার্কিং করা হয়। যেখানে, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উন্নতি দেখা যায় হ্যাপিনেস সূচকে, যেটা অনুমিত। কিন্তু, গ্র্যাজুয়েশনের ৩ মাস পর, যখন তাদের আবার হ্যাপিনেস সূচক মাপা হয়, তখন মিরাকলটা দেখা যায়। যারা অই সেশনে ছিলো, তাদের জীবন অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি সুখী ও সফল। তারা তাদের বন্ধুদের হারিয়েছিল বলে দুঃখী হয়নি, বরং, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে যে, এমন একটা জায়গায় আমি পড়তে পেরেছি, এতো ভালো বন্ধু ও শিক্ষক পেয়েছি! তাহলে আমরা কি শিখলাম? ছোট দেড় ঘন্টায় হওয়া কৃতজ্ঞতাবোধের অভিজ্ঞতা ৩ মাস পরেও আপনাকে সুখি রাখতে পারে!
কোথাও ট্যুরে গেলেও এমন হতে পারে। আমরা অনেকে এমন ভাবি যে, “ইশ! কদিন পরই আবার প্যারা!” বা “আজ রাতেই চলে যাবো!!! আবার কবে যে আসবো!”— এমন নেগেটিভ বিষয়গুলো আমাদের সেখানের আনন্দ তো নস্ট করেই, বরঞ্চ, আমাদেরকে আনন্দটা দ্রুত ভুলিয়ে দেয়। ফলে, বাসায় ফিরে দ্রুতই আমরা আবার তাড়াতাড়ি বিস্বাদ রেগুলার জীবনে চলে যাই। মনের সে আনন্দ, উচ্ছ্বলতাটা হারিয়ে যায়। নিজেকে আবার অসুখী মনে হয়।


একটা গাড়ি কিনলাম। আস্তে আস্তে প্রতিদিন চালাতে চালাতে নতুনের ফিল টা চলে যায়! এভাবে চলতে চলতে, একসময়, আমরা গাড়ি থাকা আর না থাকার পার্থক্যটা ধরতে পারিনা।
এরকম পরিস্থিতিতে আমরা কি করতে পারি? কীভাবে আমরা এ নেতিবাচক ইমোশনটাকে দূরে ঠেলে আরো বেশি আনন্দ নিতে পারি, একইসাথে সে আনন্দটাকে আরো দীর্ঘস্থায়ী করতে পারি?
এখানের মজার বিষয়টা হলো – আমরা চাইলেই কাটা দিয়েই কাটা তুলতে পারি।
কীভাবে??
আমরা তখন মনকে বলবো – যদি না আসতাম? তাহলে, কি করতাম? বাসায় বসে ঘাস কাটতাম? নাকি, বন্ধুদের ঘুরাঘুরির পোস্টে রিএক্ট দিতাম বসে বসে? এখানে নিজে আনন্দ করতে পারছি। এতো সুন্দর জায়গায় এতো সুন্দর একটা অভিজ্ঞতা হচ্ছে আমার! তাহলে, আমার কি আরো এনজয় করা উচিত না? এমন সুযোগ ক’বার পাবো আমি লাইফে?
নতুন ফোন কিনেছি? সেটার বেলায়ও। আগে যখন ফোন ছিলোনা, তখন কি করতাম? বাটন ফোনে কাজ করা যায় কিছু??সুখ কিভাবে ধরে রাখি? আগের চেয়ে তো ভালো আছি, তাইনা? আইফোন নেই আমার। ঠিক আছে, জাদুঘরে রাখা নোকিয়া তো চালাই না! মোটামুটি ভালো ফোন-ই চালাই!


আরেকটা উদাহরন দেই। বিজ্ঞানী কো এট আল ২০০৮ সালে এ নিয়ে পরীক্ষা করেন, যেখানে তিনি একদল শিক্ষার্থীকে দু’ভাগ করে একটা পছন্দের জিনিস “না পেলে কি হতো” আর “পাওয়ার পর কী হয়েছে” এটা লিখতে দেন। ফলাফলে দেখা যায়, না পেলে কি হতো – যারা লিখেছিলো, তাদের হ্যাপিনেস ২য় গ্রুপের চেয়ে ১.৫ লেভেল বেশি ছিলো!
এভাবে নিজেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ করে দিতে হবে। নেগেটিভ ইমোশোনকেই পজেটিভভাবে ব্যবহার করতে হবে। তাহলে যেমন আনন্দ বাড়বে, মনেও তার রেশ থাকবে অনেকদিন।


এটা টিপস নাম্বার ০৩!

এখানে বর্ণিত সবগুলো ট্রিকস মিলেই একটা সুন্দর অবস্থায় আসবো। লাইফে আসা নতুন কিছুর জন্য আমরা কৃতজ্ঞ থাকবো, সেটা হারানোর ভয়কে জয় করবো ও তা হতে পাওয়া সুখের স্মৃতিগুলো নিয়ে ভবিষ্যতে ভাববো।


এভাবে আমরা আমাদেরকে আরেকটু সুখি করতে পারি ও জীবনে সুখকে স্থায়ী করতে পারি। বর্ণিত ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই আমাদের অবচেতন মনে ঘটে। তাই, সবকিছু খেয়াল রাখা একটু কঠিন। কিন্তু, নিয়ন্ত্রণ করতে হবে আমাদেরই। তাহলেই সুখ নামক অধরা বস্তুর (পড়ুন অনুভুতির) দেখা পাবো ও তাকে নিজের জালে বন্দি করতে পারবো। আর, সুখের নেশায়ই তো আমাদের এতো পরিশ্রম, তাইনা? তাহলে, সামান্য কাজের ও মানসিকতার পরিবর্তনের অভাবে এ পরিশ্রমকে কেন পণ্ডশ্রমে রূপ দিবো আমরা?
আজকের পর্বে এ পর্যন্তই!
ধন্যবাদ!
আজমাইন তৌসিক ওয়াসি,
CEO, Xioxostic Creations
Junior Executive of Digital and Creative Team, BAHRN

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *