df

ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার অর্থনীতি

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে বাংলায় গোড়াপত্তন হয় ব্রিটিশ শাসনামলের। ১৮৫৮ সালের ১লা নভেম্বর রাণী ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করার মাধ্যমে শুরু হয় ইংরেজদের মুল রাজত্ব এবং ভারতবর্ষ হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশ। ব্রিটিশরা আসার পূর্বে এদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি ছিল কৃষি। কিন্তু, ব্রিটিশরা আসার পর আমাদের অর্থনীতি কেমন ছিল তা নিয়েই আজকের এই লেখটি। চলুন জেনে নেওয়া যাক ব্রিটিশ আমলের অর্থনীতি সম্পর্কে-
ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো প্রতিষ্ঠিত করে প্রাচীন শাসনকাঠামো ভেঙ্গে ঔপনিবেশিক শাসকগণ নিজেদের শাসন ও শোষণের অনুকূল এক নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সৃষ্টি করেন। যার মূল লক্ষ্য ছিল সম্পদ লুণ্ঠন ও রাজস্ব সংগ্রহ। ব্রিটিশদের প্রবর্তিত ভূমি বন্দোবস্ত প্রথা, চিরস্থায়ী ব্যবস্থা, ভূমির মালিকানা স্বত্ব প্রদান, কর আদায় ও কর ধার্যের নতুন নতুন রীতি-নীতি বাংলার অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। মোটা অঙ্কের রাজস্ব সংগ্রহের জন্য ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থা পাল্টিয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করে। এ ব্যবস্থা এক শ্রেণীর নতুন জমিদারের সৃষ্টি করে। রাজস্ব ও কর আদায়ের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণীর জন্ম হয়। ব্রিটিশ শাসক, জমিদার আর মধ্যস্বত্বভোগী এই তিন শ্রেণীর শোষণ-নিপীড়ন বাংলার কৃষককে পঙ্গু করে ফেলে। এরপরও ব্রিটিশরা তাদের শিল্প বিপ−বের স্বার্থে চালু করে জবরদস্তিমূলক নীল চাষ। নীল চাষ একদিকে জমির উৎপাদন হ্রাস করেছে অন্যদিকে কৃষককে তার দীর্ঘদিনের স্ব-উপার্জিত অর্থনীতি থেকে উৎখাত করেছে। ব্রিটিশদের প্রবর্তিত কৃষি নীতির ফলে বাংলার স্বয়ং সম্পূর্ণ গ্রাম্য অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে। কৃষক বাজার ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ প্রবর্তিত অর্থনীতি বাংলায় এক শ্রেণীর পুঁজিপতিরও সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে এই পুঁজিপতি শ্রেণীই বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে বাংলার স্থানীয় শিল্প কলকারখানার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। কেননা ব্রিটিশ শাসকগণ বাংলাকে শিল্পের কাঁচামালের যোগানদাতা হিসাবে ব্যবহার করেছে। আবার বাংলার কাঁচামাল থেকে তৈরি পোশাক বিক্রির বাজার হিসাবেও ঔপনিবেশিক শাসকগণ বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশকেই বেছে নিয়েছে। এর ফলে বাংলার তাঁত শিল্প ধ্বংস হয়েছে। ঢাকাই মসলনিরে শিল্প ধ্বংস হয়ছে। শিল্প বিপ্লবের পর বৃটেনে যেসব বড় বড় শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে তার বেশিরভাগই কাঁচামালের যোগানদাতা ছিল ভারতবর্ষ। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলায় ব্রিটিশদের লুণ্ঠনের ফলেই ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব সম্ভব হয়েছে। শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় ৬০ ভাগ কাঁচামাল বাংলা থেকে সরবরাহ হয়েছে। ব্যাপক হারে লুণ্ঠন বাংলার কৃষি ও শিল্প সমাজকে পঙ্গু করে ফেলে। ব্যাপক এই লুণ্ঠনে মাত্র ১৩ বছরের মাথায় ১৭৭০ সালে বাংলায় স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। যার ফলে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাঙ্গালি মারা যায়। এক কথায়, ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার কৃষক সমাজ রিক্ত ও নিঃস্ব হয়ে পড়ে। ভেঙ্গে পড়ে অথবা বন্ধ হয়ে যায় তাঁত কলগুলো। তবে একথা ঠিক ব্রিটিশ শাসনের ফলেই ভারতবর্ষ তথা বাংলায় পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে জোরদার করে।

ব্রিটিশরা চলে গেলেও তাদের ধ্বংস করে যাওয়া অর্থনীতি এখন ঘুরে দাড়াতে পারেনি। ব্রিটিশদের অর্থনীতি শিল্প নির্ভর হলেও আমদের অর্থনীতি এখনও কৃষি নির্ভর। এই কৃষি নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেড়িয়ে আসতে হলে আমদের প্রয়োজন সুশিক্ষায় শিক্ষিত দক্ষ যুবসমাজ। তাই, এখনি সময় নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলার এবং দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করার।

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *